তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির আন্দোলনের ফসল জুলাই বিপ্লব
একটি বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান ধূমকেতুর মতো হঠাৎ আলোর ঝলকানি নয়। এটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি থেকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা লাভার উদ্গিরণ।
কোনো দেশে বিপ্লব বা অভ্যুত্থান কেবল একটি দেয়াশলাই কাঠি নয়, বরং একটি প্রজ্বালিত অগ্নিমশাল। একটি সফল বিপ্লবের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, নিপীড়ন আর ত্যাগের অকথিত অধ্যায়। সেই ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয় না। জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।
এ লড়াইয়ের আছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন শুধু নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়, বরং তা ১৯৪৭ থেকে ধাপে ধাপে মানুষের জাগরণের এক মহাকাব্য। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ‘৭০-এর নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। ঠিক তেমনি, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব কেবল ৩৬ দিনের কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন নয়; এটি ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের বৈষম্য, দুর্নীতি, লুটপাট, ভোটাধিকার হরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ।
ছোট ছোট আন্দোলনের সামষ্টিক রূপই হলো ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী শাসনের পতন। এই দীর্ঘ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া এবং এর ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে যে জনমত সৃষ্টি করেছিল, সেই জনমতের ক্ষোভেরই বিস্ফোরণ ঘটে ৫ই আগস্ট। বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, ধারাবাহিক কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই আন্দোলনে গতি সঞ্চার করেছিল। ফলে বিএনপিকে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মূল রাজনৈতিক শক্তি এবং তারেক রহমানকে এর অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে আমাদের ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল বিজয় লাভ করে। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ স্বনির্ভর অর্থনীতি ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু দেশের এই অগ্রযাত্রা অনেকেই ইতিবাচকভাবে নিতে পারেনি। ফলে পরিকল্পিতভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সুশীল সমাজের একটা অংশ, তাদের পৃষ্ঠপোষক গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক নানা সমীকরণে একযোগে তৈরি হওয়া সংকটের ফসল ছিল ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের নেতৃত্বে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
২০০৭ সালের সেই পটপরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করা। এ সময় বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে কারারুদ্ধ করা হয়। তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। বিশেষ করে তারেক রহমানের ওপর যেভাবে বর্বরোচিত অত্যাচার করা হয়, তা রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। মূলত তখনই দীর্ঘমেয়াদী গণঅভ্যুত্থানের বীজ রোপিত হয়েছিল। ২০০৮ সালের বিতরকীত নির্বাচনের মাধ্যমে এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা হয়। কিন্তু আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র ও দেশের স্বার্থে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশ মুক্তির নতুন লড়াই শুরু করেন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তৎকালীন সরকার জনগণের ভোটাধিকার হরণের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। বেগম জিয়া তখন এক অসাধারণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলেন।
এরপর বেগম জিয়ার ওপর নেমে আসে নির্মম রাজনৈতিক নিপীড়ন। সাজানো মামলায় বিচারের নামে প্রহসন করে তাঁকে বছরের পর বছর কারান্তরীণ ও গৃহবন্দী করে রাখা হয়। বেগম জিয়ার প্রতি এই নিষ্ঠুরতা গোটা দেশের মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে। জাতির এই ক্রান্তিকালে দলের হাল ধরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি একদিকে বিএনপিকে নতুন করে সংগঠিত করেন, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক। এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারেক রহমান বিশ্ববাসীর সামনে তৎকালীন সরকারের আসল রূপ উন্মোচন করেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হয় এবং সারা বিশ্বে একটি কার্যকর কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছানো যায়, যা জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পরবর্তীতে তারেক রহমান ‘এক দফা’ আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং প্রহসনের নির্বাচন বর্জনের ডাক দেন। এর ফলে সরকারের একতরফা শাসন ব্যবস্থা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরোপুরি বৈধতাহীন হয়ে পড়ে। এটাই ছিল পতনের চূড়ান্ত ধাপ। ১৭ বছরের এই দীর্ঘ আন্দোলনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৫টিরও বেশি মামলা হয়েছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ৫০ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৫ জনেরও বেশি। এই বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, নিঃস্ব হয়েছেন এবং শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
এত নির্যাতন ও দমনপীড়নের পরও তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকে। বিএনপির এই এক দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যুক্ত হয়, তখনই তা একটি গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ৪২২ জন নেতা-কর্মী শহীদ হন। এর আগে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী শাসনামলে বিএনপির ১ হাজার ৫৫১ জন কর্মী শহীদ এবং ৪২৩ জন গুমের শিকার হন। সব মিলিয়ে এই সময়ে গুমের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০।
ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন শুধু একটি সাধারণ সংস্কার আন্দোলন ছিল না, বরং তা বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে মিশে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বিএনপির নেতা-কর্মীরা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় প্রাণ বাজি রেখে রাজপথে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। ২০০৭ সালের ১/১১-এর মাধ্যমে জনগণের যে অধিকার হরণ করা হয়েছিল, দীর্ঘ ১৭ বছরের সংগ্রামের পর ২০২৪ সালের স্বৈরাচার পতনের মধ্য দিয়ে সেই অধিকার পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হয়েছে। আর এই গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন তারেক রহমান।
প্রধান পরিবর্তনসমূহ:
-
উৎস অপসারণ: আপনার নির্দেশনা অনুযায়ী নিচে থাকা “সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন” অংশটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
-
পদবি সংশোধন: মূল টেক্সটে তারেক রহমানকে ভুলবশত ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী’ লেখা হয়েছিল, যা সংশোধন করে ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ করা হয়েছে।
-
বাক্য ও বানান পরিমার্জন: কিছু টাইপো এবং ব্যাকরণগত ত্রুটি ঠিক করে লেখাটিকে আরও প্রাঞ্জল ও মানসম্মত করা হয়েছে।
