পাবনার ফরিদপুরে কেঁচো খুঁড়তে সাপ: ৫২ বিঘা জমি দখল করতে জীবিতকে ‘মৃত’ ও মৃতকে ‘জীবিত’ বানানোর হাড়হিম করা জালিয়াতি!
অনলাইন ডেস্ক: পাবনার ফরিদপুর উপজেলার দীঘুলিয়া গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে বেরিয়ে এসেছে এক অবিশ্বাস্য ও ভয়াবহ জমি দখলের কাহিনি। প্রতিবেশীদের প্রতিবাদ আর আদালতের নিষেধাজ্ঞায় যখন নবনির্মিত মসজিদে তালা ঝুললো, তখনই একে একে ফাঁস হতে শুরু করলো গত ৪০ বছর ধরে চলা এক চক্রের জালিয়াতির ভয়ঙ্কর সব রহস্য।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বড়াল নদীর পাড়ের এই গ্রামে জমি গ্রাস করতে রাষ্ট্রীয় দলিল জালিয়াতি করে জীবিত মানুষকে মৃত এবং মৃত মানুষকে জীবিত দেখানো হয়েছে!
প্রথম কাহিনি: সপরিবারে জীবিত টুনু সাহেব কাগজে ‘মৃত’!
দীঘুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা আ.খ.ম সামছুল আলম (টুনু) বর্তমানে সপরিবারে ঢাকায় সম্পূর্ণ সুস্থ ও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। অথচ স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে তাকে কাগজে-কমলে ‘মৃত’ ঘোষণা করে। শুধু তাই নয়, একটি ভুয়া ওয়ারিশান সনদ তৈরি করে তার পৈতৃক সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হয়।
দ্বিতীয় কাহিনি: প্রয়াত মা-কে ‘জীবিত’ দেখিয়ে জাল দলিল!
জালিয়াতির এখানেই শেষ নয়; টুনু সাহেবের প্রয়াত মা সুফিরা খাতুনকে মৃত্যুর পরও জীবিত দেখিয়ে জাল দলিল প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই দলিলে মৃত মানুষের নাম ব্যবহার করে সই বা টিপসই দিয়ে তার নামের সম্পত্তিও বিক্রি করে দিয়েছে ওই চক্র। মৃত মানুষকে জীবিত দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় দলিল জালিয়াতির এই ধৃষ্টতায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মাঠের জমি দখলের খতিয়ান (মোট ৫০ বিঘার ওপরে)
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রটি বিভিন্ন মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা টুনু সাহেবদের পৈতৃক ও ওয়ারিশি সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাস করেছে। দখলকৃত মাঠের জমির বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. কেদারের দাগ: ১০০ শতাংশ
২. ডিগির ছাম: ৪৯৫ শতাংশ
৩. মরির টেক: ৫৯৪ শতাংশ
৪. আসু ডাক্তারের খেত: ৬৬ শতাংশ
৫. সালুন গারি: ১১৫ শতাংশ
৬. বেড় খাউয়া: ১৯৮ শতাংশ
৭. বুড়ী পোতাইজা মোজা: ১৬৫ শতাংশ
সর্বমোট দখলকৃত জমি: ১৭৩৩ শতাংশ (যা প্রায় ৫২.৫ বিঘা বা ৫০ বিঘার ওপরে)। এই বিশাল পরিমাণ সম্পত্তি প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জোরপূর্বক দখলে রেখেছে ওই চক্র!
রাষ্ট্রীয় দলিলে জালিয়াতি: এক নজরে চক্রের কীর্তি
আইন विशेषज्ञों মতে, ওয়ারিশ সনদ বা ভূমির দলিল একটি রাষ্ট্রীয় নথিপত্র। ব্যক্তিস্বার্থে সেখানে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া দণ্ডবিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। অথচ এই চক্রটি যা যা করেছে:
-
টুনু সাহেবকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশান সনদের মাধ্যমে সম্পত্তি আত্মসাৎ।
-
প্রয়াত মা সুফিরা খাতুনকে জীবিত দেখিয়ে জাল দলিলের মাধ্যমে জমি বিক্রি।
-
অন্য এক বহিরাগত ব্যক্তিকে টুনু সাহেবের ছোট ভাই সাজিয়ে ভুয়া দাতা খাড়া করে জমি রেজিস্ট্রি।
যদিও অভিযুক্তদের ভাই সংবাদ মাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন, “ওয়ারিশ সার্টিফিকেটে টুনুকে মৃত দেখানো আমাদের ভুল হয়েছে।” তবে সচেতন মহল ও আইনবিদরা বলছেন, এটিকে নিছক ‘ভুল’ বলে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই; এটি একটি পরিকল্পিত ও গুরুতর রাষ্ট্রীয় অপরাধ।
ধর্মের নামে জমি দখলের মহোৎসব!
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিজেদের এই অবৈধ দখলদারিত্বকে পবিত্রতা দিতে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে ধর্মের নাম ব্যবহার করছে চক্রটি। একাধিক ভুক্তভোগীর জমি জোর করে কেটে মসজিদের সীমানায় ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে: ১) ভুক্তভোগী ইব্রাহিম সিপাহির ১২ শতাংশ জমি মসজিদের ভেতরে নেওয়া হয়েছে। ২) ভুক্তভোগী নুরুল ইসলামের ৩ শতাংশ জমি জোরপূর্বক মসজিদের ভেতরে ঢোকানো হয়েছে।
জমি ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারবার সময় পার করছে দখলকারীরা। উল্টো জমির মালিকরা প্রতিবাদ করতে গেলে দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি। নির্মাণের সময় কেটে ফেলা হয়েছে জমির মূল্যবান গাছপালাও। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী স্পষ্ট জানিয়েছেন, “জালিয়াতি ও জবরদখল করা জায়গায় নামাজ পড়া ইসলামের দৃষ্টিতেও সঠিক হবে না।”
আদালতের স্থিতাবস্থা ও প্রশাসনের বক্তব্য
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিরুপায় হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হলে, আদালত মসজিদটির যাবতীয় নির্মাণকাজ ও কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা (নিষেধাজ্ঞা) জারি করেন। আদালতের নির্দেশে বর্তমানে বিতর্কিত ওই মসজিদটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
এ বিষয়ে ফরিদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম আকঞ্জি জানিয়েছেন, “আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে সেখানে স্থিতাবস্থা বজায় রয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা হবে।”
জীবিতকে মৃত আর মৃতকে জীবিত দেখিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ৫০ বিঘার বেশি জমি আঁকড়ে থাকা এই চক্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও ভূমি প্রশাসন এবার কী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
