Latestপ্রযুক্তি

ডিজিটাল আসক্তিতে ঝুঁকিতে দেশের শিক্ষার্থী: বর্তমান সংকট ও করণীয়

বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে লাগামহীন ‘স্ক্রিনটাইম’ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করছে। একদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে এখনো কোনো কার্যকর নীতিকাঠামো তৈরি হয়নি।

ক্ষতিকর প্রভাব: মনোযোগ ও পারিবারিক সম্পর্ক ধ্বংস

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট আসক্তি মাদকের মতোই ক্ষতিকর। এর প্রধান ক্ষতিকর দিকগুলো হলো:

  • মানসিক ক্ষতি: মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে এটি মনোযোগ ও স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি নষ্ট করছে। শিশুদের কল্পনাশক্তি লোপ পাচ্ছে এবং তারা বাস্তব জগৎ ছেড়ে কাল্পনিক ‘ফ্যান্টাসি’র মধ্যে বাস করছে।

  • শারীরিক সমস্যা: অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতার কারণে শিশুরা চোখের ‘ড্রাই আই’ রোগ, তীব্র মাথা ব্যথা, স্থূলতা এবং অনিদ্রায় ভুগছে।

  • পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা: সন্তানরা মা-বাবার কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকার ঘরে একা থাকা, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় অনীহা দেখাচ্ছে।

  • অপরাধপ্রবণতা: অতিরিক্ত অস্থিরতা থেকে অনেক কিশোর সহিংস গ্যাং কালচারের দিকে ঝুঁকছে। র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে গ্রেপ্তার হওয়া ১,১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যের অধিকাংশেরই যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা টিকটক।

গবেষণার ভয়াবহ পরিসংখ্যান

  • স্ক্রিনটাইম: আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর মতে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন ও গেমিং ডিভাইসে কাটাচ্ছে।

  • শারীরিক জটিলতা: গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে।

  • ঘুমের ব্যাঘাত: ‘নেচার অ্যান্ড সায়েন্স অব স্লিপ’ জার্নালের গবেষণা অনুযায়ী, যারা দিনে ৪-৫ ঘণ্টার বেশি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের ঘুমের গুণমান অত্যন্ত খারাপ।

  • সাইবার বুলিং: ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ তরুণ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: বিশ্ব যখন কঠোর

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করছে:

  • যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া: ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ প্রধান সামাজিক মাধ্যমগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। আইন অমান্য করলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশাল অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

  • চীন: বয়সভেদে স্ক্রিন টাইম সীমিত করতে ‘মাইনর মোড’ চালু করেছে। ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য দৈনিক ৪০ মিনিট এবং ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ২ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নাবালকদের জন্য অনলাইন গেম ও সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ।

  • ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশ: ফ্রান্স হাই স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের প্রস্তাব বিবেচনা করছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে, স্পেন ও স্পেনসহ বেশ কিছু দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের আইনি শূন্যতা ও সরকারি অবস্থান

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি, যার বড় অংশই তরুণ। অথচ:

  • ‘শিশু আইন ২০১৩’ বা ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫’—কোনো আইনেই শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ওপর কোনো বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা নেই।

  • সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী ১৬ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও টিনএজারদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি বা আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংকট উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

দেশের শিশু-তরুণদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন:

  1. আইনি নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশেও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং বয়স যাচাই প্রক্রিয়া (Age Verification) বাধ্যতামূলক করতে হবে।

  2. আইন সংশোধন: ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংশোধন করে শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইন লঙ্ঘনকারী প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর জরিমানার বিধান রাখতে হবে।

  3. পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি: স্কুল পর্যায় থেকেই পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়ম এবং সাইবার বুলিং মোকাবেলার উপায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

  4. সচেতনতা বৃদ্ধি: গ্রামাঞ্চলসহ সব স্তরের অভিভাবকদের অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

  5. বিকল্প ব্যবস্থা: শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলা, মাঠের ব্যবস্থা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং সেন্টার ও হেল্পলাইন চালু করাও জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *