Latestখেলাধুলা

যুদ্ধে বাবা-ভাই হারানো ফুটবলার: মায়ের অনুপ্রেরণায় বিশ্বকাপে

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় কাঁপছে গোটা বিশ্ব। বৈশ্বিক এই আসর যেমন অনেককে নায়ক বানায়, তেমনি কাউকে করে তোলে ট্রাজিক হিরো। তবে সব ছাপিয়ে এই বিশ্বকাপ অনেকের জন্য হয়ে ওঠে জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসার এক অনন্য মঞ্চ। এবারের বিশ্বকাপে তেমনই এক রূপকথার গল্প লিখলেন ইরাকি ফুটবলার আয়মেন হুসেন। চরম প্রতিকূলতা পার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ইরাকের এই অধিনায়ক।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে চরম ঝুঁকিতে, সেই নরককুণ্ড থেকে ফুটবলের হাত ধরেই আজ তিনি বিশ্বমঞ্চে।

শৈশবের ট্র্যাজেডি ও বাবার স্বপ্নভঙ্গ

ইরাকের আল-হাউইজা জেলার আল সাফরায় জন্ম আয়মেনের। চারপাশের গুলির আওয়াজ, বোমার বিস্ফোরণ আর অনিশ্চয়তাই ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল ফুটবল। কিন্তু মাত্র ১২ বছর বয়সে এক চরম ট্র্যাজেডি নেমে আসে তাঁর জীবনে।

আয়মেনের বাবা ছিলেন ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক। তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে আল কায়েদার জঙ্গিরা। সে সময় নিজেদের মাথা গোঁজার একটি বাড়ি তৈরির জন্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়েছিলেন আয়মেন। বাবার অসমাপ্ত সেই বাড়ি আর কোনো দিন সম্পূর্ণ হয়নি। বহু বছর পর ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আয়মেন নিজেই শুনিয়েছিলেন সেই কষ্টের কাহিনি:

“ফুটবল ভালোবাসতাম ঠিকই, কিন্তু আমার আসল স্বপ্ন ছিল কোনোমতে টাকা জমিয়ে বাবার শুরু করা ওই অসমাপ্ত বাড়িটার নির্মাণকাজ শেষ করা।”

দ্বিতীয় আঘাত এবং মায়ের জেদ

কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস সেখানেই শেষ হয়নি। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে আয়মেন তাঁর মা এবং বড় ভাইকে (যিনি নিজেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন) ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাঁরা রাজি হননি।

পরবর্তীতে তুরস্কের একটি ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ফেরার সময় আরও এক মর্মান্তিক খবর পান আয়মেন। আইএসআইএস (ISIS) অধ্যুষিত এলাকা থেকে তাঁর বড় ভাইকে অপহরণ করা হয়, যাঁর আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি। এই জোড়া ধাক্কায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন আয়মেন। ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করেন তিনি।

কিন্তু সেই কঠিন সময়ে তাঁর মা হাল ছাড়তে দেননি। মায়ের অদম্য ইচ্ছা আর জেদের কাছে হার মেনেই আয়মেন আবার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন তাড়া করতে শুরু করেন। আর এই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর জীবন।

দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ইরাক

ইরাকের দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আয়মেন। প্লে-অফ পর্বে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে মূল পর্বের টিকিট কাটে ইরাক, আর সেই ম্যাচটিতে তাঁর পা থেকেই আসে জয়সূচক গোলটি।

এরপর শুরু হয় বিশ্বমঞ্চে নিজের মহাকাব্য লেখার লড়াই। বোস্টন স্টেডিয়ামে ‘আই’ গ্রুপে নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত এক গোলে ইরাককে সমতায় ফেরান আয়মেন। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৪ মিনিটের মধ্যে আর্লিং হালান্ডের গোলে ফের এগিয়ে যায় ইউরোপের দেশ নরওয়ে। এরপর ৭৬ মিনিটে লিও ওস্টিগার্ড গোল করেন। আর ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ইরাকের আত্মঘাতী গোলে নরওয়ের ব্যবধান আরও বাড়ে। দুর্ভাগ্যবশত, সেই আত্মঘাতী গোলটি আসে আয়মেনের শরীরে লেগেই।

ম্যাচের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, জীবনের সব যুদ্ধ জিতে আসা আয়মেনের এই লড়াই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশ্বকাপের এই বীরত্বগাথার পর, আয়মেন নিশ্চয়ই এবার তাঁর বাবার সেই অসমাপ্ত বাড়িটি সম্পূর্ণ করতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *