Latestরাজনীতি

‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়’: নিজের কথার জালেই ফেঁসে গেলেন সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফেডারেল আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন (Extradition Request) পাঠাতে হবে। রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

দেশে ফেরানোর মূল ধাপসমূহ:

  • নথিপত্র প্রস্তুতকরণ: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় মামলা, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে।

  • কূটনৈতিক চ্যানেলে আবেদন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানো হবে।

  • সমন্বয় ও হস্তান্তর: আবুধাবির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।

গ্রেপ্তারের পটভূমি ও ইন্টারপোলের রেড নোটিস

গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এনসিবি আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয়।

ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবির আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করেছিল (কন্ট্রোল নম্বর: এ-৫১৭৪/৪-২০২৫)। নোটিসে তাকে ‘বিচারের জন্য পলাতক আসামি’ (Fugitive Wanted for Prosecution) হিসেবে উল্লেখ করে ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা ও অভিযোগসমূহ

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সাবেক এই পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে:

১. জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা

  • অভিযোগ: ২০২৪ সালের আগস্টে দুদকে জমা দেওয়া বিবরণীতে তিনি ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দিলেও অনুসন্ধানে ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদ গোপনের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে আরও ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

  • বর্তমান অবস্থা: এই মামলায় ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে এবং চলতি বছরের ৩ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়েছে।

২. পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা

  • অভিযোগ: ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও তিনি নিজেকে ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ পরিচয় দিয়ে প্রতারণামূলক উপায়ে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। এই কাজে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া হয়নি।

  • অন্যান্য আসামি: এই জালিয়াতিতে সহযোগিতার অভিযোগে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের চারজন কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে।

৩. অর্থ পাচার (মানিলন্ডারিং) মামলা

  • অভিযোগ: ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাচারের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়। দীর্ঘদিনের এফডিআর হিসাব মেয়াদপূর্তির আগেই নগদায়ন করে বিপুল অর্থ উত্তোলন ও তা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য:

“জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।”

উল্লেখ্য, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক—এই তিন শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান। ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে তার অবৈধ সম্পদের খতিয়ান প্রকাশ্যে আসার পর দুদক অনুসন্ধান শুরু করে এবং পরবর্তীকালে তিনি সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *